ঢাকা ভার্সিটি থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট তোলা (Issue transcript from Dhaka university)

আমেরিকার বেশীরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই এপ্লিকেশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনার্স এবং মাস্টার্সের অফিসিয়াল ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠাতে হয়। অনেকে হার্ড কপি না চাইলেও ট্রান্সক্রিপ্টের সফট কপি আপলোড করতে বলে অনলাইন এপ্লিকেশনে। এজন্য ট্রান্সক্রিপ্ট উঠিয়ে রাখা ভালো। আর কোথাও ভর্তি হতে হলে তো ট্রান্সক্রিপ্ট লাগবেই! তবে অনেক ভার্সিটির অনলাইন এপ্লিকেশনে লেখা থাকে, ট্রান্সক্রিপ্ট “অথবা” মার্কশিট (যেটা আসলে আমাদের রেজাল্ট) আপলোড করার কথা। এসব ক্ষেত্রে (যদি আপনার হাতে তখন ট্রান্সক্রিপ্ট না থাকে) আপনি নির্দ্বিধায় মার্কশিট আপলোড করে দিতে পারেন। আর যদি মার্কশিটের অপশন দেওয়া না থাকে, তাহলে গ্র্যাজুয়েট অফিসের অনুমতি নিয়ে ট্রান্সক্রিপ্টের বদলে মার্কশিট আপলোড করতে পারেন।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, আপনি যদি এখন অনার্স চতুর্থ বর্ষের স্টুডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহলে তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত ট্রান্সক্রিপ্ট উঠানোর সুযোগও আপনার আছে। মানে ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে চাইলে যে আপনাকে অনার্স পাশ করে আসতে হবে, তা নয়। যেকোনো বর্ষে থাকাকালীন অবস্থায়ই আপনি পূর্ববর্তী বর্ষের ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে পারবেন।

ভূমিকা শেষ। এখন আসি বর্ণনায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট উঠানো একটু প্যাঁচের কাজ। হাতে সময় নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের ৩০৫ নাম্বার রুম হল আপনার গন্তব্য। এখানে গেলে কয়েকজন স্যার, ম্যাডামকে দেখবেন সবসময় সাহায্য করার জন্য তৈরি হয়ে আছেন। উনাদেরকে “ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাইতে চাহি” বললে আপনাকে একটা ৪/৫ পৃষ্ঠার ফর্ম ধরিয়ে দেবেন। ফর্মের মূল্য সম্ভবত পঞ্চাশ টাকা। সেটায় আপনার নাম, ঠিকানা, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, অনার্স মাস্টার্সের বিভিন্ন কোর্সের নাম এবং মার্কস, পরীক্ষার সন এবং রোল নাম্বার, সেশন ইত্যাদি বেসিক তথ্য উল্লেখ করতে হবে।

ফর্মটায় জায়গা খুবই কম। তাই সব বিষয়ের নাম লেখার জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে। আবার ঘরগুলো এতো ছোট যে, আপনার বিষয়গুলোর নাম নাও আঁটতে পারে। সেজন্য চিন্তিত হবেন না। কারণ এই ফর্মটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এখানে বিষয়ের নাম অর্ধেক লিখলেও সমস্যা নেই। ট্রান্সক্রিপ্ট বানানো হবে আপনার রেজাল্টের ফটোকপি দেখে। তাই ফর্মে “বেসিক” তথ্যগুলো ঠিকমতো দেবেন যেন অফিস তাদের রেকর্ডের সাথে মিলিয়ে আপনার রেজাল্ট দেখতে পারে। আবার ফর্মটায় রেজাল্ট উল্লেখ করার ঘরে সিজিপিএ-র অপশন দেওয়া। এটা দেখে যারা রেজাল্ট পেয়েছেন “ক্লাস” পদ্ধতিতে, তাদের ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আপনি প্রাপ্ত মোট নাম্বারই লিখবেন।

যা হোক, ফর্ম পূরণ করে সেটা আপনার সব ইয়ারের রেজাল্টের ফটোকপিসহ একটা ফাইলে যত্ন করে রাখুন। এখন সময় প্রয়োজনীয় টাকা জমা দেওয়ার। “কতো টাকা?” প্রশ্ন করলে উত্তর হবে যে, আপনি নরমাল আর আর্জেন্ট – এই দুই উপায়ে ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে পারেন।

১) নরমাল উপায়ে প্রতিটি ট্রান্সক্রিপ্টের জন্য চারশো টাকা লাগবে। মানে শুধু অনার্স বা শুধু মাস্টার্স। কিন্তু আপনি যদি দুটো পরীক্ষার ট্রান্সক্রিপ্ট একসাথে তুলতে চান, তাহলে পাঁচশো টাকা লাগবে আর সময় লাগবে এক মাস। আপনি ইচ্ছা করলে অনার্সের চার বছরের আলাদা আলাদা ট্রান্সক্রিপ্টও তুলতে পারেন।

২) আর্জেন্ট উপায়ে প্রতিটি ট্রান্সক্রিপ্টের জন্য এক হাজার করে টাকা লাগবে আর সময় লাগবে সাত দিন।

পছন্দমতো অপশন বেছে নিয়ে টাকা জমা দিতে প্রস্তুত হন। ভাবছেন, এখানে আবার প্রস্তুতির কী আছে? হেহে!

টাকা জমা দেওয়ার জন্য আলাদা ফর্ম আছে। সেটা বিনামূল্যেই দেওয়া হবে। এক পৃষ্ঠার ওই ফর্মে আপনার নাম, পিতার নাম, বর্তমান ঠিকানা, পরীক্ষার নাম-সন লিখবেন। নীচের অংশে কয়টা ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে চান, সেটা লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর ফর্মটা ৩০৫ নং রুমে জমা দিলে ট্রান্সক্রিপ্টের সংখ্যানুযায়ী সেখানে টাকা লিখে দেওয়া হবে।

এই ফর্ম নিয়ে এখন দৌড়ান টিএসসির জনতা ব্যাঙ্কে। সেখানে বিরাট লম্বা হলুদ ফর্মে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে তিনবার একই জিনিস (নাম, ঠিকানা এবং টাকা জমা দেওয়ার কারণ) লিখুন। তারপর ফর্মসহ টাকা জমা দিন। জমাদানের রশিদ নিয়ে ফের দৌড়ান রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে।

৩০৫ নং রুমে এই ফর্মসহ রসিদ দেখালে আপনাকে রসিদটা দিয়ে দেওয়া হবে। আর এই ফর্মের সাথে জমা দিতে হবে রেজাল্টের ফটোকপিসহ যে ফর্ম পূরণ করেছিলেন, সেটা। রসিদ দেখিয়ে আপনি নির্দিষ্ট সময় পর ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে পারবেন।

অফিসিয়াল খাম উত্তোলনঃ

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠাবেন যে অফিসিয়াল নীল খামে, সেটা কেনার জন্যেও টাকা জমা দিতে হবে টিএসসির জনতা ব্যাঙ্কে। তাই বারবার না দৌড়ে একেবারেই খামের জন্য নির্দিষ্ট ফর্ম (“খাম কিনিতে চাহি” বললে দিয়ে দেবে) পূরণ করে, একই সাথে ট্রান্সক্রিপ্ট আর খামের জন্য টাকা জমা দিতে পারেন। নতুবা দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে মনে হতে পারে, ব্যাংকের নাম জনতা নয়, যাতনা ব্যাংক। বলা দরকার যে, প্রতিটা খামের দাম চারশো টাকা।

ট্রান্সক্রিপ্ট উঠানোর জন্য সময় লাগলেও খামের জন্য এই হ্যাপা পোহাতে হয় না। তাই টাকা জমাদানের রশিদ দেখালে তখনই আপনাকে খাম ধরিয়ে দেওয়া হবে। সাথে সাথে খামে সিল মেরে দিতে বলুন। এই কাজটা করতে একদম ভুলবেন না। আর যদি ভুলেই যান, তাহলে পরে সিল মারতে চাইলে আবার রসিদ সহ আসতে হবে। রসিদ ছাড়া সিল দেবে না কেউ, আর রসিদ হারিয়ে যেতে কতক্ষণ?

ট্রান্সক্রিপ্টের ফটোকপি সত্যায়িত করাঃ

একই সাথে আপনি অনেকগুলো মূল ট্রান্সক্রিপ্ট উঠাতে পারেন। আবার একটা মূল ট্রান্সক্রিপ্ট উঠিয়ে সেটার ফটোকপিও সত্যায়িত করে নিতে পারেন। ফটোকপি অবশ্যই অফসেট পেপারে করবেন। নরমাল ত্যানা পেপারে নয়। সত্যায়িত করার বেলায় ট্রান্সক্রিপ্টের প্রতিটা পৃষ্ঠার জন্য ৫০/- টাকা করে লাগবে। আপনি যদি সকাল সকাল কাজ শুরু করেন, তাহলে বিকেল পাঁচটার মধ্যেই সত্যায়িত করে ফেলতে পারবেন। অর্থাৎ কাজ খতম একদিনেই।

নিয়মও একই।

৩০৫ নাম্বার রুম থেকে “ট্রান্সক্রিপ্টের ফটোকপি সত্যায়িত করিব” বলে ফর্ম নিন। পূরণ করুন আপনার নাম, পিতার নাম, বর্তমান ঠিকানা, পরীক্ষার নাম-সন। নীচের অংশে কয়টা ট্রান্সক্রিপ্ট সত্যায়িত করতে চান, সবগুলোর মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা লিখুন (যেমন – ট্রান্সক্রিপ্ট যদি হয় পাঁচ পৃষ্ঠার এবং আপনি যদি সত্যায়িত করতে চান তিন কপি ট্রান্সক্রিপ্ট, তাহলে মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা হবে ১৫)। স্বাক্ষর দিন। এরপর ফর্মটা ৩০৫ নং রুমে জমা দিলে ট্রান্সক্রিপ্টের সংখ্যানুযায়ী সেখানে টাকা লিখে দেওয়া হবে (১৫*৫০=৭৫০/-)।

চলে যান জনতা ব্যাংকে। রসিদ নিয়ে এসে ফর্মসহ ফটোকপিগুলো জমা দিন। তবে এগুলোর সাথে ট্রান্সক্রিপ্টের অতিরিক্ত একটা ফটোকপিও (অফিসের কাজের জন্য। এটা ত্যানা পেপারে হলেও অসুবিধা নেই) আপনাকে জমা দিতে হবে।

উপসংহারঃ 

দেখলেন তো, একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন কীভাবে? এভাবেই বাসা থেকে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, সেখান থেকে টিএসসির জনতা ব্যাংক, সেখান থেকে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং এবং তারপর বাসা।

শুভং ট্রান্সক্রিপ্ট উঠনং:

মন্তব্য

5 comments

  • আশরাফ

    ভাই, প্রভিসিওনাল ট্রান্সক্রিপ্ট জিনিশ টা কি? সবগুলা ট্রান্সক্রিপ্ট হাতে না থাকলে কিভাবে অ্যাপ্লাই করব? ৮ টা সেমিস্টার এর মধ্যে ৭ টা সেমিস্টার এর ট্রান্সক্রিপ্ট নিয়ে কি অ্যাপ্লাই করা সম্ভব? প্রসিডিউর টা কি??

    • ফরহাদ হোসেন মাসুম

      মানে, অসম্পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট। অনেক ভার্সিটিতে অসম্পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট সহ এপ্লাই করতে দেয়, অনেকে দেয় না। তাই, বিদেশের ভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট কোওর্ডিনেটরদের সাথে যোগাযোগ করুন।

  • মোঃ মাহবুবুল ইসলাম

    নির্ঝর আপু/মাসুম ভাই,

    আমার ভার্সিটি প্রথমে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধীনে ছিল। যখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠলাম, তখন সেটি পুরোপুরি পাবলিক ইউনিভার্সিটি! ফলে, আমার চার বছরের গ্র্যাজুয়েশনের প্রথম বছরের সার্টিফিকেট ঢাকা ইউনিভার্সিটির। বাকি তিন বছর আমার নিজের ভার্সিটির। প্রশ্নগুলো একটা একটা করে নিচে দেই –
    ১. এখন শুধু প্রথম বছরের সার্টিফিকেট সত্যায়িত করতে হলে, এই আর্টিকেলের শেষ পর্যায়ে যেভাবে লেখা হয়েছে সেভাবে কি করব?
    ২. সেক্ষেত্রে, টোটাল খরচ (এটেস্টেড+খাম সহ) কত হবে?
    ৩. ওভারঅল কত সময় লাগবে?
    ৪. কিছু কিছু ইউনিভার্সিটি প্রভিশনাল সার্টিফিকেট দিলে খুব প্যারা দেয়। আসল সার্টিফিকেট পাঠানোর জন্য লাফালাফি করে কিন্তু এখনও আমাদের কনভোকেশন হয় নাই। বোঝাতে বোঝাতে পাগল হতে হয় মাঝে মাঝে !!!

    • নির্ঝর রুথ

      ১) ঢাকা ভার্সিটি থেকে শুধু অনার্স প্রথম বছরের ট্রান্সক্রিপ্ট সত্যায়িত করতে হলে এই আর্টিকেলে উল্লিখিত উপায়ে সত্যায়িত করতে হবে।
      ২) অনার্স প্রথম বছরের ট্রান্সক্রিপ্ট তোলার জন্য ৪০০/- এবং খামের জন্য ৪০০/-, মোট ৮০০/- লাগবে।
      ৩) এটা আপনি ভার্সিটি থেকে জেনে নিবেন।
      ৪) এক্ষেত্রে বুঝানো ছাড়া কোনো উপায় আছে বলে জানি না।

      ধন্যবাদ।

      • মোঃ মাহবুবুল ইসলাম

        নির্ঝর আপু,

        অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে রিপ্লাইয়ের জন্য। কিন্তু আমার প্রশ্নটা আরেকটু ক্লিয়ার করে দেই।

        ১. যখন আমাদের ১ম বর্ষের রেজাল্ট হয়েছিল, তার কিছুদিন পরেই কিন্তু আমাদেরকে মার্কশিট দিয়ে দেয়, যেটা হালকা নীল রঙের কাগজ দেখতে। এখন এই মার্কশিটের প্রায় ৮টা ফটোকপি এটেস্টেড করতে চাচ্ছি। যতদূর বুঝি, এটাই তো একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, তাই না? নাকি আলাদা কোন একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট আছে?
        ২. যদি না থেকে থাকে, তাহলে তো (এটেস্টেড ৫০/- + খাম ৪০০/-) = ৪৫০*৮ = ৩৬০০/- হবার কথা। কোন ভুল করলাম কি?
        ৩. আরেকটা কথা; যেহেতু শুধু এটেস্টেড করা, তাহলে তো একদিনেই হয়ে যাবার কথা। ঠিক?

        বিরক্ত করার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আসলে ফ্রি ফ্রি সাহায্য পেয়ে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে :v :v 🙂 🙂

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।