এখনো কিছুই শেষ হয়নি – মাইনুল কাদের

(নেক্সটপ গ্রুপে মাইনুল কাদেরের লেখা পোস্ট থেকে)

বেশ কিছু দিন আগে বলেছিলাম একটা নোট লিখবো, কিন্তু সময়ের অভাবে লিখতে পারিনি বলে দুঃখিত। এইটা মনে হয় গ্রুপে আমার দ্বিতীয় নোট এবং পুরো নোটটি এই মুহূর্তে যারা হতাশ তাদেরকে নিয়ে। যারা দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টায় আছেন কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাননি, তাদের হতাশার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে নোটটি লিখছি এবং নোটটি বেশ বড়। আপনার জন্য প্রযোজ্য না হলে এড়িয়ে যেতে পারেন।

আপনি জীবনের যেকোন মুহুর্তে যে কোনো বিষয় নিয়ে হতাশ হতে পারেন, সেটা খারাপ কিছু না। যদি হতাশা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে সমস্যা। চলুন একটি গল্প শুনি। দেখি উচ্চশিক্ষা নিয়ে আপনার হতাশা কতটুকু যৌক্তিক।

“সময় তখন ২০১৩ সাল, এক ছেলে আমেরিকাতে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করে GRE, টার্গেট- Fall, 2014। যত দিন যায় GRE তার কাছে বিরক্তিকর বস্তুতে পরিণত হতে থাকে। বার বার চিন্তা করে ছেড়ে দিবে, কিন্তু সে ধৈর্য ধরে, লেগে থাকে। একসময় সে GRE দেয়, IELTS দেয়, মোটামুটি স্কোর আসে। হতাশ হয় কিন্তু হাল ছাড়ে না। সে নিজে নিজে প্রতীজ্ঞা করে, শুরু যখন করেছি এর শেষ দেখে ছাড়বো। এইবার শুরু হয় আরেক যুদ্ধ- ইউনিভার্সিটি সিলেকশন, এই যেন খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা । আমেরিকার মোটামুটি সব ইউনিভার্সিটি ঘেঁটে সে তার প্রোফাইল অনুসারে ২০০ ইউনিভার্সিটি ঠিক করে যোগাযোগের জন্যে। শুরু হল ইমেইল পাঠানোর কাজ, রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ইমেইল পাঠানো আর সারা রাত তীর্থের কাকের মত রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায় বসে থাকা।

একটার পর একটা রিপ্লাই আসতে থকে আর হতাশা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। মাঝে মধ্যে এক দুইটা আবার আশা বাণীও শুনায়। অনেক আলোচনা সমালোচনার পর সে ৫টা ইউনিভার্সিটি সিলেক্ট করে এপ্লাই করার জন্য। ফেব্রুয়ারিরর মধ্যে এপ্লিকেশন কমপ্লিট! এইবার শুরু হল অপেক্ষার পালা। দিন যায়, মাস যায় কিন্তু অপেক্ষা আর শেষ হয়না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সে বাথরুমে যেতে ভুলে যায়, কিন্তু ইমেইল চেক করতে ভুলে না। আবার হতাশা দানা বাঁধতে শুরু করে। সে হতাশা কয়েকশ গুণ বেড়ে যায় যখন পর পর দুইটা রিজেকশন আসে।

একসময় মরুভূমিতে বৃষ্টি হয়ে আসে বাকি তিনটা ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন, কিন্তু খুশি হবার তেমন কোন সুযোগ ছিল না। কারণ, একটি বলেছিল ফান্ড দিবে না আর বাকি দুইটা বলছে অপেক্ষা করতে। আবার সেই অপেক্ষা, আবার সেই হতাশা। অবশেষে মে মাসের কোনো এক রাতে পাই সেই কাঙ্ক্ষিত ইমেইল – আমরা আপনাকে টিউশন ওয়েভার সহ টিচিং এসিস্ট্যান্টশীপ অফার করছি। পোলারে আর পায় কে? কিছুদিন পর ছিল তার মাস্টার্স পরীক্ষা। কিসের পরীক্ষা, কিসের কী! তারপর পরও বন্ধুদের জোরাজোরিতে মাস্টার্স পরীক্ষায় নাম মাত্র অংশগ্রহণ করেছিল।

পরীক্ষা শেষ করেই জুলাই মাসের ২ তারিখ ভিসা ইন্টার্ভিউ ঠিক করল। এর মধ্যে আমেরিকা নিয়ে কত প্ল্যান, কত উৎসাহ। জুলাই মাসের ২ তারিখ ঠিক সময়ে আমেরিকান এম্বেসিতে উপস্থিত। সবাই মুখিয়ে আছে তার সুখবর শুনার জন্য কিন্তু ভিসা অফিসার শুনালো দু:সংবাদ- Sorry! we can’t issue your visa this time (ভুল ওরই ছিলো, ফিন্যানশিয়াল স্টেটমেন্টের জন্য সব টাকা এক একাউন্টে দেখাতে গিয়ে এই সমস্যা হয়েছিলো। একাধিক একাউন্ট থেকে সবগুলো এক একাউন্টে এনেছিলো সে। ভেবেছিলো, সেটা বেশি ভালো হবে। কিন্তু এরকম করতে গিয়ে স্টেটমেন্টের শেষের দিকে অনেক বড় বড় লেনদেন দেখা যাচ্ছিলো। এটার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি সে)। ছেলেটি প্রথম কয়েকদিন কিছু চিন্তা করতে পারেনি, He was just blank, কী ঘটলো সে বুঝেই উঠতে পারছিলো না। এডমিশন হলো, ফান্ড পেলো, আমেরিকা উড়াল দেয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন; কিন্তু ভিসা হলো না।

একবার চিন্তা করুন সে ছেলেটির কথা, সে দিনগুলোর কথা। সেই দিনগুলোতেও ছেলেটি ধৈর্য ধরেছিল, হতাশাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, বলেছিল এর শেষ সে দেখেই ছাড়বে। ওইদিন সে চুপ ছিল কিন্তু হাল ছাড়েনি। নিজের কাজটুকু সে ঠিকঠাক কিরে যাচ্ছিল, ফলাফল- সে সফল Fall- 15 এ। কিছু কাছের মানুষ ছাড়া কেউ জানতো না। সিদ্ধান্ত ছিল ভিসা নিয়ে সবাইকে জানাবে এবং সে ভিসা নিয়েই সবাইকে জানালো। তাকে দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সে আজকে আমেরিকা। চিন্তা করে বলুন তো, এতকিছুর মাঝে সে যদি একবার হাল ছেড়ে দিতো, তাহলে তা সম্ভব হতো কিনা?”

সত্যি বলতে কি, এইটা কোনো গল্প না, এই সবকিছুই ঘটেছে আমার জীবনে। আপনার অবস্থা যদি এর থেকে খারাপ হয় তাহলে আপনাকে সমবেদনা জানানো ছাড়া আর কিছু বলার নেই। আর যদি অবস্থা এর থেকে ভাল হয় তাহলে আপনার এখনো কিছুই শেষ হয়নি। নতুন উদ্যমে আবার শুরু করুন, যদি আপনার লক্ষ্যে দৃঢ় থাকেন, আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি আপনিও একদিন এইরকম গল্প লিখবেন। একবার হাল ছেড়েছেন তো সব শেষ। আমি এই গ্রুপের অন্তত দুইজন সদস্যের কথা জানি, যাদের প্রোফাইল অনেক ভাল হওয়া শর্তেও পর পর দুই বছর ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তারা একবারের জন্যও হাল ছাড়েননি। প্রতি বারই শুরু করেছে নতুন উদ্যমে। ফলাফল, দুই জনই এখন ভাল ফান্ড নিয়ে আমেরিকাতে PhD করছে।

শেষে যারা সফল হয়েছেন তাদেরকে শুভেচ্ছা আর যারা এখনো সফলতা পাননি তাদের জন্য শুভ কামনা।

মাইনুল
গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাস
(নেক্সটপ-ইউএসএ এর প্রাক্তন ছাত্র)

মন্তব্য

2 comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।