নেক্সটপঃ পরিচয়, উৎপত্তি, ও উদ্দেশ্য

অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল আমাদের শুভাকাংক্ষীদের জন্যে একটি কনফেশন করা উচিত। সবার জানা উচিৎ, আমরা কে? কী করছি? কেন করছি? কিভাবে শুরু?

১.
জিআরই দিয়ে ফেলেছি তখন। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরি করছি। ভাল চাকুরি। মুম্বাই ঘুরে আসলাম ট্রেইনিং এর জন্যে। তারপরেও কেন যেন মন টেকেনা। কিছু করার নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলে আমি। চাকুরি ছেড়ে দেবার প্রশ্নই ওঠে না। এক ছুটিতে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড মাসুমের বাসায় গেলাম। আমাদের সাথে দেখা করতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা মাসুমের বাসায় এসেছে। মাত্র জিআরই দিয়েছি। সবাই অভিজ্ঞতা শুনতে চায়। তাদেরকে বোঝাচ্ছি কিভাবে কী করতে হয়। এক পর্যায়ে একজন বলে বসলো, ভাইয়া আপনারা আমাদের এগুলো অনেক আগের থেকেই বলে আসছেন। কিন্তু খুব একটা লাভ হচ্ছে না। আমাদের সরাসরি হেল্প দরকার। আপনারা আমাদের পড়ান। আমি আর মাসুম একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম জিআরই একটু সিরিয়াস হলে নিজে নিজে পড়া সম্ভব। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তাদের একটাই কথা তাদেরকে পড়াতে হবে। আমরা হ্যাঁ–না কিছু না বলেই আলোচনা শেষ করে দিলাম।

রাতে খাওয়ার পর চা খেতে বাইরে বের হলাম। মাসুম বললো, “আমাদের কিন্তু ওদের পড়ানো উচিত। এরা সবাই ভাল স্টুডেন্ট। সামান্য হেল্প পেলে সবাই ভাল করবে”… আমার না বলা ছাড়া উপায় ছিল না। ঢাকা থেকে এসে এসে পড়ানো সম্ভব ছিলনা। আমি জানি মাসুমের একার পক্ষেও জিআরই ম্যাটেরিয়াল বানানো, ক্লাস নেয়া অনেক বেশি প্রেশার হয়ে যায়। আর ও আমাকে ছাড়া কিছু করবেও না। আমি ঢাকা চলে আসলাম।

২.
চাকুরী আগেই ভাল লাগত না। চিটাগং থেকে ফেরার পর অসহ্য লাগতে শুরু করলো। কেন যেন মনে হল আমার জন্মই হয়েছে পড়ানোর জন্যে। ক্লাস এইট থেকে আমি ছাত্র পড়াচ্ছি। আমার কাছে পড়ে কেউ যদি আমেরিকা পি এইচ ডি করতে যেতে পারে , তাহলে কি দারুণ ব্যাপারটাই না হবে! আব্বাকে বললাম চাকুরী করবো না। উনি বললেন, “তোর ইচ্ছা। যা খুশি তাই কর।”

“হ্যালো মাসুম, রেডি থাকো। চিটাগং আসছি। এক্কেবারের মত!! :D”

৩.
২-৩ ঘণ্টা গবেষণা করলাম পুরো প্রজেক্টটা নিয়ে। ড্রাফট করে ফেললাম কী কী করতে হবে। দুইজনের মাথায় আইডিয়া কিলবিল করছে। কিন্তু একটা যুৎসই নাম ঠিক করতে পারলাম না। কাজির দেউড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। উপলক্ষ্য, আমার চিটাগং চলে আসা উপলক্ষে চিকেন চাপ খাওয়া হবে। খাওয়া শেষ করে রিক্সায় উঠে সিগারেট ধরালাম। হটাৎ দৈববাণীর মত মাথায় এলো, “নেক্সটপ-ইউএসএ” আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম। মানে হচ্ছে Our next stop is USA! 🙂

৪.
আমরা ক্লাস নেয়া শুরু করেছিলাম একটি ভার্সিটি ভর্তি কোচিং এর ক্লাস রুমে। সমস্যা শুরু হলো। প্রত্যেক পেজ ফটোকপি ১.৩০ টাকা। রুম ভাড়া দিতে হবে। অনেক হিসাব নিকাশ করে আমরা কোর্স ফি ঠিক করলাম। স্টুডেন্টরা সবাই একবাক্যে সায় জানিয়ে দিল।

কোনো একটা কারণে ওই কোচিং সেন্টারের মালিকেরা আমাদের পছন্দ করতো না। অদ্ভুত অদ্ভুত যন্ত্রণা দিতো। ক্লাস নিতে গিয়ে দেখি অন্য ক্লাস চলছে। জিজ্ঞেস করলে বলতো, “অপেক্ষা করেন”। যদিও তাদের দেয়া রুটিন অনুযায়ী ওইসময় ক্লাস হওয়ার কথা না। সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম। আরেকদিন ডেকে নিয়ে বললো আমরা যখনই ক্লাস নিবো, তার আগে যেন মালিকের পারমিশন নিয়ে নি। পারমিশন নিতে গিয়ে দেখা যেত মালিক নাই। আমাদের ক্লাস শুরু করতে দেয়া হতনা।

বুঝতে পারলাম এভাবে পারা যাবেনা। নিজেদের জায়গা লাগবে। কিন্তু এতো টাকা কোথায় পাবো? অতঃপর মাসুমের বাসা চেঞ্জ করা হল। সিদ্ধান্ত হলো – ওর বেড রুম আর ড্রয়িং রুম ক্লাস এবং অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রতিদিন রাতে বেঞ্চ গুলো একপাশে সরিয়ে ঘুমাতে হতো। এক স্টুডেন্ট মার্কার বোর্ড গিফট করলো। চেয়ার কিনতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। একেকটা চেয়ার ১৮০০ টাকা। বেঞ্চ বানালে ২৫০০, বুঝতে পারলাম কোন টাকা বাচঁবে না। মাসুম আমাকে বলে দিলো হেঁটে আসতে। ভাড়া দেয়া সম্ভব না। শুরু হল প্রতিদিন মুরাদপুর থেকে ওয়াসার মোড় ৩ কিমি হেঁটে এসে ক্লাস নেয়া। মাসুম কিছু টিউশনি করতো অনেক দূরে দূরে। সেও হেঁটে আসা-যাওয়া শুরু করলো, ২ ঘন্টাতো লাগতোই। তারপরেও নেক্সটপ বন্ধ করে দেবার চিন্তা করিনি। চিটাগং এর বিভিন্ন ভার্সিটিতে সেমিনার করলাম। সবাই কে “হায়ার স্টাডি ইন ইউএসএ” এর ব্যাপারে জানানো বাড়িয়ে দিলাম।

তারপরেও বুঝতে পারছিলাম নেক্সটপ দিয়ে শুধু চিটাগং এর ছাত্রদেরই সাহায্য করা যাবে। কিন্তু সারা বাংলাদেশে প্রচুর সম্ভাবনাময় স্টুডেন্ট আছে যারা কিনা তথ্যের অভাবে কখনও চেষ্টাই করবেনা। শুরু হল নোট লেখা। মাসুমই শুরু করলো। এত সময় নিয়ে, এত মায়া নিয়ে লেখা আমাদের নোট গুলি! জানি বললে বেশি শোনাবে, আমি আজ পর্যন্ত হায়ার স্টাডি ইন ইউএসএ নিয়ে লেখা আমাদের থেকে ভাল নোট পড়িনি। একটা দায়িত্ববোধ থেকে আমরা নোট গুলো লিখেছি। যাদের কাছে আমরা পৌঁছুতে পারবো না, তাদের কথা ভেবে লিখেছি।

৫.
ক্লাস নেয়া, নোট লেখা আর সেমিনার করা নিয়ে দিনগুলো ভালই চলে যাচ্ছিলো। হঠাত একদিন বৈশাখের প্রচন্ড গরমের মধ্যে একটু শীতল হাওয়ার মতই খবর চলে এলো আমার ইউএসএর একটা স্কুলে পিএইচডি এর জন্যে ফুল ফান্ডিং হয়ে গেছে। সাথে একটা দুশ্চিন্তাও এল। নেক্সটপ থাকবে তো? মাসুম একা পারবে তো? মাসুম অভয় দিল। নেক্সটপ যা দেখে যাচ্ছি, তার থেকে বড় হবে। আর ওকে একা কাজ করতে হবেনা। আমরা যেভাবে পড়িয়েছি, আমাদের পুরোনো স্টুডেন্টরাই চমৎকার পড়াতে পারবে। কত খারাপ আচরণটাই না আমরা করেছি আমাদের স্টুডেন্টদের সাথে। সবাই অ্যাডাল্ট, তারপরেও প্রতিদিন পড়া নেয়া, পড়া ঠিকমত না দিতে পারলে বকাঝকা কিছু বাদ দেইনি। এরা কি আমাদের সাথে থাকবে?

৬.
এরা ছিলো আমাদের সাথে। আজ দুই বছর পর নেক্সটপের আলাদা অফিস হয়েছে। আমাদের স্টুডেন্টরা নেক্সটপের শিক্ষক হয়েছে। এখান থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে তারা স্কোর সেন্ড করেছে, ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করেছে। আমাদের স্টুডেন্ট সাইফুল ইসলাম ভাই এখন ইউএসএ তে ফুল ফান্ড নিয়ে পিএইচডি করছে। এখন নেক্সটপের একজন একটিভ কর্মী। ইরফান ভাই, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। শত ব্যস্ততা সত্বেও প্রতিদিন এসেছেন। ক্লান্তির কথা ভুলে গিয়ে আবার নেক্সটপেও ক্লাস নিয়েছেন। নেক্সটপের হাল ধরেছেন। লিটন ভাই, আমাদেরই স্টুডেন্ট। এখন একা হাতে নেক্সটপ চালাচ্ছেন। মাসুমও আর বাংলাদেশে নাই। সেও ইউএসতে পড়াশোনা করতে চলে এসেছে ফুল ফান্ড নিয়ে। তখন আর ভয় পাইনি। ততদিনে বুঝে গেছি, যদি কোন কাজ ভাল নিয়তে শুরু করা হয়, সেটা বন্ধ করার সাধ্য কারো নেই। নেক্সটপ চলছে। নেক্সটপ চলবে।

মাসুমের তো এখন পোয়াবারো। ২৫ মেগাবাইট পার সেকেন্ড ইন্টারনেট স্পিড কে কাজে লাগানো শুরু করে দিয়েছে। আমরা জানি শুধু নোট দিয়ে সবার কাছে পৌছানো যাবেনা। ভিডিও বানানো শুরু করলো হায়ার স্টাডির বিভিন্ন তথ্য নিয়ে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি তথ্য যদি উন্মুক্ত হয়, অনেক মানুষের অনেক উপকার হবে। আমি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আজ এখানে। যখন প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম অনেকেরই হাসির পাত্র হয়েছি। এই গল্প গুলো মানুষ কে না জানালে ওরা সাহস করবে কি করে? সেই জন্যে প্রতিদিন বিভিন্ন পোষ্টের মাধ্যমে আমরা আরো দূরে পৌছাতে চেষ্টা করছি যেখানে নেক্সটপ নেই।

অনেকে বলবেন এগুলো সবই মার্কেটিং পলিসি। আমাদের এত কষ্ট করে করা কাজ যদি মার্কেটিং এর জন্যেই করা হত, তাহলে ফেসবুকের পেইজে আমাদের এত কষ্ট করে পোষ্ট দিতে হতো না। যারা আমাদের কাছে প্রতিদিন পড়তে আসছে, তাদেরকে নিয়ে আমরা থাকতে পারতাম। দায়িত্ববোধ থেকে নেক্সটপ শুরু করেছিলাম। নিজের দায়িত্বের কথা ভুলে যাইনি আমরা। কোচিং ছাড়াও সম্ভব জিআরই এর প্রিপারেশন নেয়া। আর যারা তারপরেও আমাদের সাহায্য চান, কথা দিচ্ছি, যারা টাকা দিয়ে কোচিং এ পড়তে পারছেন না, যারা টাকা দিয়ে পড়তে পারতেন অথবা চট্টগ্রামে থাকেন না, তাদের কথা আমরা কখনই ভুলে যাব না। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে এটা নিশ্চিত করা যাতে কোন পটেনশিয়াল এপ্লিকেন্ট যেন তথ্যের অভাবে হারিয়ে না যায়। প্রয়োজনে জিআরই একদিন অনলাইনে পড়ানো হবে। ৩ ফিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে যে আন্তরিকতার সাথে আমরা পড়িয়েছিলাম, ১৩৫০০ কিমি দূর থেকেও সেটা করবো। মাসুম ইতোমধ্যেই ভোকাবুলারির জন্য ভিডিও কোর্স বানিয়ে রিলিজ করেছে। সামনে আরো হবে।

আমাদের শুধু একটাই অনুরোধ, আমাদের সাথে থাকুন। যদি মনে হয় আমরা ভাল কিছু করার চেষ্টা করছি, আমাদের কথা বলুন সবাইকে। আমাদের সাথে কাজ করুন, আমাদের সাথে না থেকেও কাজ করুন। যে যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসুন। আসুন সবাই মিলে বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে ফেলি। আমাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ডঃ জাফর ইকবাল, ডঃ রাগিব হাসান দের মত অনেকেই যারা সারা বিশ্বের সামনে বারবার আমাদের মাথা উচুঁ করে দিয়েছে। চলুন সবাইকে খুঁজে বের করি, আবারও প্রমাণ করি আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি……হয়তো তারপরেও আমাদেরকে অনেকে আদর করে শিক্ষা ব্যবসায়ী ডাকবে, রক্তচোষা ডাকবে। কেউই কখনো আমাদেরকে দেখিয়ে বলবে না, “দেখো ওরা কষ্ট করছে সবার জন্যে”…. প্রশংসার দরকার নেই। যখন আমরা দেখবো প্রতিবছর ইউএসএ ফুল ফান্ড নিয়ে আসা স্টুডেন্টের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, আমাদের কষ্ট সার্থক হবে ওই দিন।

৭.
ল্যাবে বসে লিখছিলাম। রাত ১২.৩০টা বাজে এখানে। একটু পর বাসায় যাব। হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমার জ্বর চলে আসছে, নিখাদ উত্তেজনা থেকে। প্রত্যেকটা অক্ষর টাইপ করার সময় সেই দিন গুলি মনে পড়ছিল। শুধু অতীত নয়, আমি এখন সামনের দিনগুলোও দেখতে পাচ্ছি। উজ্বল রৌদ্রস্নাত দিন…

মন্তব্য

6 comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।